কুমোরটুলির ইতিহাস: ২৫০ বছরের ঐতিহ্যে গঙ্গার মাটি-খড়েই প্রাণ পান দেবী দুর্গা

কুমোরটুলির ইতিহাস: ২৫০ বছরের ঐতিহ্যে গঙ্গার মাটি-খড়েই প্রাণ পান দেবী দুর্গা

কুমোরটুলির আড়াইশো বছরের ঐতিহ্য

উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি বাংলার মৃৎশিল্প ও দুর্গা প্রতিমা তৈরির অন্যতম ঐতিহাসিক কেন্দ্র। আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় শিল্পীরা গঙ্গার মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামো ব্যবহার করে দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে আসছেন।

কীভাবে তৈরি হল কুমোরটুলি?

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ আমলে কলকাতার বিভিন্ন পেশার কারিগরদের জন্য আলাদা আলাদা এলাকা গড়ে উঠতে শুরু করে। মৃৎশিল্পীদের বসতি ধীরে ধীরে কুমোরটুলি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে মূলত জমিদার ও বনেদি বাড়ির পুজোর জন্য প্রতিমা তৈরি করা হলেও পরবর্তীতে বারোয়ারি ও সর্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

খড়, মাটি ও শিল্পীর হাতের কারুকাজ

কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো খড় দিয়ে তৈরি কাঠামোর ওপর ধাপে ধাপে মাটির প্রলেপ দেওয়া। গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলের মাটি ব্যবহার করে শিল্পীরা প্রতিমার শরীরের সূক্ষ্ম অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন। এরপর রং, অলংকার ও সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমা সম্পূর্ণ রূপ পায়।

মহালয়ার চক্ষুদান

প্রতিমা তৈরির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর একটি হলো চক্ষুদান। শিল্পীর তুলির নিখুঁত টানে দেবীর চোখ আঁকার পর প্রতিমায় যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। এই ঐতিহ্য কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। মাটির পাশাপাশি বর্তমানে ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে হালকা ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বিদেশে প্রতিমা পাঠানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিমার চাহিদাও রয়েছে।

রথযাত্রায় শুরু হয় প্রতিমা তৈরির প্রস্তুতি

অনেক শিল্পীর কাছে রথযাত্রার দিন থেকেই নতুন প্রতিমা তৈরির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। কাঠামো পূজা করে শুরু হয় বাঁশ, খড় ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ। এরপর ধাপে ধাপে মাটি দেওয়া, শুকানো, রং করা এবং সাজসজ্জার কাজ চলে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কুমোরটুলির প্রতিমা

কুমোরটুলির খ্যাতি এখন কলকাতা বা ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালিদের দুর্গাপুজোর জন্য এখানকার শিল্পীদের তৈরি প্রতিমা সমুদ্র ও আকাশপথে পাঠানো হয়।

বাঙালির সংস্কৃতির জীবন্ত ঐতিহ্য

কুমোরটুলি শুধু প্রতিমা তৈরির জায়গা নয়, এটি বাঙালির শিল্প, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও কারিগরি ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত নিদর্শন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পীদের হাতে গড়ে ওঠা এই মৃৎশিল্প আজও কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।