ঝাড়খণ্ডে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল রাজনীতি, ৩ পরীক্ষা বাতিলের পরও CBI তদন্তের দাবিতে অনড় পড়ুয়ারা

ঝাড়খণ্ডে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল রাজনীতি, ৩ পরীক্ষা বাতিলের পরও CBI তদন্তের দাবিতে অনড় পড়ুয়ারা

ঝাড়খণ্ডে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা

ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন ক্রমশ বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। রাঁচিতে বিধানসভা অভিযানের সময় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ আন্দোলনের চাপের মুখে রাজ্য সরকার একাধিক পরীক্ষা বাতিল এবং প্রশাসনিক স্তরে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।

আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হল ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (JSSC) কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল বা JSSC-CGL পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত। পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-এর মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার একাধিক দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানালেও CBI তদন্তের প্রশ্নে আন্দোলনকারীদের অবস্থান এখনও কঠোর।

তিনটি JPSC পরীক্ষা বাতিল

আন্দোলনের জেরে ঝাড়খণ্ড সরকার ১৪তম JPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের JPSC ব্যাকলগ পরীক্ষাও বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে তিনটি পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পরও আন্দোলন থামেনি। চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশের বক্তব্য, শুধুমাত্র পরীক্ষা বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিশেষ করে JSSC-CGL পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁরা সামনে রেখেছেন।

JPSC-র তিন সদস্যের পদত্যাগ

পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা JPSC-তেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। কমিশনের তিন বর্তমান সদস্য ড. অজিতা ভট্টাচার্য, ড. অনিমা হাঁসদা এবং ড. জামাল আহমেদ পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের পদত্যাগ রাজ্যপাল গ্রহণ করেছেন বলে জানা গিয়েছে।

এই পদত্যাগের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। CID-এর জিজ্ঞাসাবাদের আগে কমিশনের তিন সদস্য পদত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার প্রক্রিয়া ও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে চলতে থাকা বিতর্কের মধ্যে তাঁদের পদত্যাগ রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১১ অগস্ট বিজেপির রাজ্যব্যাপী বনধ

ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের প্রতিবাদে ১১ অগস্ট ঝাড়খণ্ড বিজেপি রাজ্যব্যাপী বনধের ডাক দিয়েছে। রাঁচিতে বিধানসভা অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাতের অভিযোগকে সামনে রেখেই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিজেপির দাবি, চাকরিপ্রার্থীদের ন্যায্য দাবির পরিবর্তে তাঁদের উপর প্রশাসনিক কঠোরতা প্রয়োগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনের একাধিক দাবিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। সরকার দাবি করেছে যে আন্দোলনকারীদের অধিকাংশ দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু CBI তদন্তের দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।

রাহুল গান্ধীকে ঘিরে বিজেপির পাল্টা আক্রমণ

ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে পাল্টা অভিযোগ ও রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির পক্ষ থেকে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের জবাবে বলা হয়েছে, কংগ্রেস ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন সরকারের জোটসঙ্গী। তাই ছাত্রদের দাবির প্রতি সত্যিই সমর্থন থাকলে কংগ্রেসের সরকারের উপর চাপ তৈরি করা উচিত এবং প্রয়োজনে সমর্থন প্রত্যাহার করা উচিত।

সংসদেও ঝাড়খণ্ড ইস্যুতে বিক্ষোভ

ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব সংসদেও পড়েছে। এই ইস্যুকে সামনে রেখে NDA এবং INDIA জোটের সাংসদদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও স্লোগান দেখা গেছে। ফলে সংসদের বাদল অধিবেশনের কার্যক্রমেও বিষয়টি রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।

সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলন ও পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে সংসদে জবাব দিতে প্রস্তুত। বিজেপির অভিযোগ, সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বিরোধীরা সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করছে। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি প্রয়োজন।

আন্দোলনের পরবর্তী দিক

তিনটি পরীক্ষা বাতিল, JPSC-র তিন সদস্যের পদত্যাগ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের মূল প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মেটেনি। বিশেষ করে JSSC-CGL পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের CBI তদন্তের দাবি আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে পরবর্তী আলোচনার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে বিষয়টি এখন রাজ্য রাজনীতি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছে। বিজেপির বনধ, কংগ্রেস-বিজেপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং সংসদে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে ঝাড়খণ্ডের চাকরি পরীক্ষার বিতর্ক আগামী দিনগুলিতে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: JPSC ও JSSC পরীক্ষাকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ বর্তমানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের বিষয়। CBI তদন্তের দাবি আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলেও, তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যাবে না।